শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১
Logo
সাবাস বাংলাদেশ; এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়

সাবাস বাংলাদেশ; এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়

"সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।" স্বাধীনতার পরপর বাংলাদেশকে বলা হতো "তলাবিহীন ঝুড়ি"।

 

আজ বাংলাদেশকে বলা হয় দারিদ্র্য দুরীকরণের পথপ্রদর্শক, আর সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশকে দেখানো হয় নিজের পায়ে দাঁড়ানো দেশের উদাহরণ হিসেবে। আর তার উৎকৃষ্ট উদাগরণ রচিত হলো গৌরবের পদ্মাসেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। আর একবার প্রমাণিত হলো বাঙ্গালী জাতি কোন রক্তচক্ষু-ষঢ়যন্ত্রের কাছে মাথা নত করেনা।

 

বাঙ্গালীর বিরত্ব আর দুঃসাহস বারবার পৃথিবীকে অবাক করে দেয়। বাংলাদেশিদের জন্য গৌরবের একটি স্থাপনা পদ্মা সেতুর সর্বশেষ স্প্যানটি বসেছে বৃহস্পতিবার। অনেক ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে আমরা এই সেতুর মাধ্যমে পদ্মার দুই পারকে সংযুক্ত করতে পেরেছি। প্রমত্তা পদ্মার বুকে নিরবচ্ছিন্নভাবে দৃশ্যমান হয়েছে প্রায় সোয়া ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি।

 

সেতুর স্টিলের অবকাঠামো পদ্মার দুই পারের মানুষের মনে স্বপ্নের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। আনন্দের হিল্লোল বইছে মানুষের মনে। একই সঙ্গে সমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলের স্বপ্নও বাস্তবের বড় কাছাকাছি চলে এসেছে। এখন সেতুর এই অবকাঠামোর ওপর বসবে সড়ক স্ল্যাব, আর নিচে বসবে রেলওয়ে স্ল্যাব। এ কাজগুলোও অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সড়কের ওপর পিচ হবে।

 


গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ হবে। অপটিক্যাল ফাইবারের সংযোগ হবে। ইলেকট্রিক ট্রেনের অবকাঠামো হবে। সব মিলিয়ে এক বিশাল আয়োজন। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ২ মিনিটে ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয় ৪১তম স্প্যানটি। এর মাধ্যমেই দৃশ্যমান হয়েছে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু। এর আগে বুধবার দুপুরের পর মাওয়া কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে ৩ হাজার ৬০০ টন ধারণক্ষমতার ভাসমান ক্রেন ‘তিয়ান-ই’ শেষ স্প্যানটি নিয়ে রওনা হয়। এরপর বিকেল সাড়ে ৫টার পর ক্রেনটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পৌঁছায়। পরে বৃহস্পতিবার ৪১তম স্প্যানটি বসানোর পর দৃশ্যমান হয় পদ্মাসেতু।

 

এই সেতুটি নিমার্ণের শুরু থেকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ছিল। বিরোধীতা, মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও গুজবও ছিল। সেসব কিছু ছাপিয়ে জয় হয়েছে বাঙালির একটি বড় স্বপ্নের। সড়কপথে যোগাযোগের দূরাবস্থা লাঘবে ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ’ প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল।

 

এরপর ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) মাধ্যমে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। সেই সম্ভাব্যতার ওপর ভিত্তি করে ২০০৭ সালে পদ্মা বহুমুখী সেতুর মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করা হয়। তখন ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা খরচে ২০০৭-২৮ থেকে ২০১৪-২০১৫ মেয়াদে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন হয়।

 

প্রথম সংশোধিত ডিপিপি পর্যন্ত মোট প্রকল্প ব্যয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকার মধ্যে ১৬ হাজার ২৪৯ কোটি ৫২ লাখ (৭৯ দশমিক ২৪ শতাংশ) টাকা বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) দেয়ার কথা ছিল। সেই লক্ষ্যে ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক, একই বছরের ১৮ মে জাইকা, ২৪ মে আইডিবি এবং ৬ জুন এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু সহযোগী এই আন্তর্জাতিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানই একসময় পদ্মা সেতুর মূল প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।


ঘটনার সূত্রপাত ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই মাসে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়া চলাকালীন কানাডীয় কোম্পানি ‘এসএনসি-লাভালিন’ এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি পদ্মা সেতুতে এসব বিদেশি ঋণদাতা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও অর্থ প্রদান স্থগিত করে দেয়।

 

বিশ্বব্যাংক অর্থ প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করলে ২০১২ সালের ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের জনগণের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্তের কথা জানান। সেই সিদ্ধান্তে দেশের মানুষের ব্যাপক সমর্থনও পান প্রধানমন্ত্রী। অবশ্য বিশ্বব্যাংক আরোপিত দুর্নীতির অভিযোগের কলঙ্ক বেশিদিন বইতে হয়নি বাংলাদেশকে। ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কানাডার টরেন্টোর একটি আদালতে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের দুর্নীতির এই অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।

 

কানাডার আদালতের রায়ে বলা হয়, ‘এই মামলায় যেসব তথ্য দেয়া হয়েছে, তা অনুমান-ভিত্তিক, গালগল্প এবং গুজবের বেশি কিছু নয়।’ এর আগে ২০১৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুই দফা অনুসন্ধান করেও বিশ্বব্যাংকের ওই অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রায়গুলো অনেক আগেই মিথ্যা কলঙ্কের অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তবে প্রতাপশালী আন্তর্জাতিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ ছাড়াও যে বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর মতো বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারে, সেই আর্থিক ও মানসিক সক্ষমতার বাস্তব প্রমাণ হয়েছে বৃহস্পতিবার পদ্মা সেতুতে সর্বশেষ স্প্যান স্থাপনের মাধ্যমে।

 

এই জয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অযথা বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের। দুর্নীতি চেষ্টার দুয়ো তুলে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের কারণে সেতুর কাজ শুরু করতেই বিলম্ব হয় চার বছর।

 

কানাডার আদালত এই অভিযোগ গালগপ্প বলে উড়িয়ে দেয়ার পর বাংলাদেশে থেমে যায় সমালোচনা। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে খুলে দেয়া হবে সেতু। কিন্তু ২০২০ সালের শেষে এসে বসল সব স্প্যান। এর মধ্যে ‘গুজব’ রটে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন যে প্রচারণা চালানো হয় যা ‘কুচক্রী মহলের গুজব’ বলে জানায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

 

বিষয়টি গুজব হিসেবে চিহ্নিত করে সে সময় দেশবাসীকে অবহিত করতে গণমাধ্যমে প্রচারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রধান তথ্য কর্মকর্তাকে অনুরোধও জানানো হয়। চিঠিতে সে সময় আরও জানানো হয়, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলে।

 

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সকালে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয় ৪১তম, অর্থাৎ সর্বশেষ স্প্যানটি। ৪০তম স্প্যান বসানোর ছয় দিনের মাথায় বসানো হলো এ স্প্যান। ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি স্প্যান বসানোয় ৬ হাজার ১৫০ মিটার সেতুর অবকাঠামো দৃশ্যমান হলো। দুই মাসে সেতুতে আটটি স্প্যান বসিয়ে রেকর্ড গড়েছেন দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা।

 


এ মাসেও দুটি স্প্যান বসানোর মাধ্যমে বিজয়ের মাসে স্প্যান বসানোর কাজটি সম্পন্ন হলো। সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর ৪১তম স্প্যান ‘টু-এফ’ সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক (মূল সেতু) দেওয়ান আবদুল কাদের।

 

মূল সেতু নির্মাণের কাজটি করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) ও নদীশাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি কোম্পানি সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোমেন লিমিটেড।


সিনোহাইড্রো করপোরেশনই পদ্মা সেতুর জন্য নদীশাসনের কাজ করছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত সে কাজের ৭৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে নভেম্বর পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ ৮২ দশমিক ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছিল।


৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে মোট দেশজ উৎপাদন ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়বে এবং প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমবে বলে সরকার আশা করছে।

 

সংযুক্ত থাকুন