বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১
Logo
শত বছরেও হয়নি কপিলমুনি-কানাইদিয়া ব্রিজ

শত বছরেও হয়নি কপিলমুনি-কানাইদিয়া ব্রিজ

ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকোই ভরসা

দুই পারে দুই উপজেলা, এক পারে খুলনার পাইকগাছা বাণিজ্যিক শহর কপিলমুনি অন্যপারে সাতক্ষীরার তালা উপজেলা মাঝখানে বহমান কপোতাক্ষ নদ। আর নদ পারাপারে একমাত্র ভরসা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো।


সুন্দরবন উপকূলীয় দক্ষিণ জনপদের বাণিজ্যিক কেন্দ্র খুলনার কপিলমুনি-সাতক্ষীরা তথা ভারতের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কপোতাক্ষ নদের ওপর ব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা ব্রিটিশ শাষনামল থেকে পোষণ করছিল আধুনিক কপিলমুনি (বিনোদগঞ্জ) প্রতিষ্ঠাতা রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু।


তৎকালীন কপিলমুনি-কানাইদিয়া ব্রিজ সাতক্ষীরা সদর হয়ে কলিকাতা পর্যন্ত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। সে সময় ব্রিজ নির্মাণের জন্য কলিকাতা স্টেট ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকাও জমা রাখা হয়। তবে সৃষ্টিশীল নানা চিন্তায় ঐসময় ব্রিজ নির্মাণ সম্ভব না হলেও কলিকাতার ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার লভ্যাংশ আসতো কপিলমুনির বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে।


এরপর ক্ষণজন্মা বিনোদ বিহারী সাধু অকাল মৃত্যুতে থমকে যায় ব্রিজ নির্মাণ স্বপ্ন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রায় সাহেবের রেখে যাওয়া টাকার লভ্যাংশ কিংবা কোনো টাকা ফেরৎ না পেলেও এলাকাবাসী ব্রিজ নির্মাণে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেন। তবে স্বাধীনতাপরবর্তী একপর্যায়ে ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ব্রিজটির নির্মাণ কাজ শুরু করে। প্রায় ১শ’ বছরের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভরা যৌবনা কপোতাক্ষের উপর ব্রিজ নির্মাণ কাজ শুরু হলেও গত ২১ বছরেও তা শেষ হয়নি।


মাঝ পথে নানা অযুহাতে নির্মাণকাজ বন্ধের সাথে সাথে মৃত্যু হয় বিস্তীর্ণ জনপদের সাধারণ মানুষের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্নের। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তৎকালিন সময় কপিলমুনি-সাতক্ষীরার জেঠুয়া ব্রিজ নির্মাণ কাজে সরকার ১ কোটি ৯৩ লাখ ৪২ হাজার ৯০০শ’ ১৯ টাকা ৫৫ পয়সা ব্যয় বরাদ্দ দেয়। তবে উপকরণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি ও কাজের মান উন্নয়নে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদার প্রেক্ষিতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়ে তা ২কোটি ৩৬ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। দরপত্র বিজ্ঞপ্তির পর নির্মাণের দায়িত্ব পান ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এন হক এসোসিয়েট।


কার্যাদেশ পেয়ে প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সালের ১২ এপ্রিল এর কার্যক্রম শুরু করে ২০০৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আংশিক কাজ করে আইএফআইসি ব্যাংক খুলনা শাখা হতে ১ কোটি ৬৭ লাখ ৭২২ টাকা উত্তোলন করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। ওই সময় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। খুলনা মহানগর হাকিম আদালতে দায়েরকৃত মামলা নং পি-৫৮/০৬। ধারা ৪০৬/৪২০/১০৯/৩৪। যার ফলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে মামলা সহ নানা জটিলতা ও দীর্ঘ সূত্রতার কারণে ব্রিজ নির্মাণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।


ব্রিজটির বাকী কাজ সমাপ্ত করতে ইসলাম গ্রুপ নামের আরো একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পুনরায় ওই নির্মাণ কাজ শুরু করলেও নদের বক্ষে নির্মিত ১৮টি পিলারের কয়েকটি বেঁকে যাওয়ায় মূলত তারাও কাজটি সম্পন্ন করতে না পারায় স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় এর নির্মাণ কাজ। আর এই আংশিক কাজ শেষ হওয়া পিলারে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পলি জমে কপোতাক্ষের নাব্যতা হ্রাস পায়। মৃতপ্রায় কপোতাক্ষ নদকে পুণর্জীবিত করতে কপোতাক্ষ পাড়ের দুই জনপদের মানুষ নদ খননের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করে।


যার ফলশ্রুতিতে ২০১১ সালে কপোতাক্ষ নদ খননে প্রায় ২৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। এলাকাবাসীর অভিযোগ, কপোতাক্ষ খননের সময় অসমাপ্ত ব্রিজের ১৮টি পরিত্যক্ত পিলার অপসারণ না করেই খনন কাজ সম্পন্ন করা হয়। ফলে পিলারগুলোর কারণে একদিকে যেমন জোয়ার-ভাটায় পলি জমে ভরাট হচ্ছে অন্যদিকে নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে।


সর্বশেষ পিলারের কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কপোতাক্ষ হারাবে তার নাব্যতা এবং আবারও জলাবদ্ধতার স্বীকার হবে ৫০ লাখের উর্ধ্বে কপোতাক্ষ পারের দুই জনপদের মানুষ। নদটিকে ঘিরে রয়েছে বহু ইতিহাস-ঐতিহ্য। কপোতাক্ষকে ঘিরে এর দু’তীরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বাণিজ্যিক নগরী ও জনবসতি।


বর্তমান খুলনা-৬ সংসদ সদস্যদের আন্তরিকতা ও উন্নয়ন বান্ধব সরকারে কাছে এ জনপদের মানুষ আবারো স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে ব্রিজটি বাস্তবায়নের। কপিলমুনি ইউপি চেয়াম্যান কওছার আলী জোয়াদ্দার জানান, এটি খুবই ব্যাস্ততম একটা ঘাট। দু’পারের লোকদের যাতায়তের জন্য কপোতাক্ষ নদের উপর ব্রিজ নির্মাণের কোনো বিকল্প হতে পারে না।


তালা-কলারোয়া সাংসদ সদস্য মুস্তাফা লুৎফুল্লাহ মুঠোফোনে বলেন, কপিলমুনি বাজারে মধ্যে দিয়ে জমিছাড়া ব্যাপারে ওখানকার কেউ রাজি না, তাছাড়া আরো কিছু টেকনিক্যাল কারণে ওখানে ব্রিজটা হচ্ছে না।


তবে তালা উপজেলায় ঘোষনগরে প্রস্তাবিত ডিও লেটারসহ সয়েল স্টেস ও সার্ভিয়ার হয়ে গেছে, এটা সাতক্ষীরা এলজিডি বাস্তবায়ন করছে। এ ব্যাপরে খুলনা-৬ সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু মুঠোফোনে যোগাযোগ করে না পাওয়ায় তার মতামত জানা যায়নি।

 

সংযুক্ত থাকুন