মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১
Logo
যশোরে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পনির মত খাজনা আদায় করা হচ্ছে

যশোরে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পনির মত খাজনা আদায় করা হচ্ছে

যশোর সদরের তেতুলিয়া বাগেরহাট বাজারের ব্যবসায়ীদের ওপর চলছে চরম অমানুষিক নির্যাতন। খাজনা আদায়ের নামে শোষণ করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। তেতুলিয়া বাগেরহাট বাজারে খাজনা আদায়ে নীল করদের হার মানিয়েছে।


ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত খাজনা আদায় করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। ইতিমধ্যে উচ্চ খাজনা আদায়ের কারণে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।


ব্যবাসয়ীরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।


ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তেতুলিয়া বাগেরহাট বাজারে শাসক দলের যশোরের এক জনপ্রতিনিধির পিএস পরিচয়দানকারী সাঈদ ওরফে জাহিদ। ওই জনপ্রতিনিধর বাড়ির কাজের লোকও বলে কেউ কেউ জানে। আবার অনেকে জনপ্রতিনিধির আশ্রিত ক্যাডার জাহিদ ওরফে সাঈদ বলে জানায়। তিনিই ওই বাজারের হর্তাকর্তা।


জনপ্রতিনিধির নাম ব্যবহার করে সকল প্রকার পুলিশি হুমকি, অনিয়ম-দুর্নীতি, দখলবাজ, মারপিটসহ বিভিন্ন প্রকার অন্যায়-অত্যাচার চালিয়ে আসছে। ভয়ে এলাকার কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না ওই জনপ্রতিনিধির কারণে।


ব্যবসায়ীরা জানায়, এই বাজারে সপ্তাহে শুক্র, রবি ও মঙ্গলবার তিন দিন হাট বসে। গত বছর এই হাটের ইজারাদার ছিলো জাহিদ ওরফে সাঈদ। গত বছরের টাকা পরিশোধ না করার কারণে এ বছর সোলাইমান খান র‌্যাফেল হাটটি ইজারা নেন। র‌্যাফেলের নামে হাটটি ইজারা দেয়া হলেও হাটের হত্তাকর্তা জাহিদ ওরফে সাঈদ। আগে প্রতি হাটে ৫০ টাকা খাজনা নিতো।


এ বছর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) ৫০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সেটি বাড়িয়েছে জাহিদ ওরফে সাঈদ। তারা এখন প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭০ টাকা হারে খাজনা আদায় করছেন। আর এই খাজনা আদায় করছেন সাঈদের কাকা আব্দুল হালিম জমাদ্দার ও তার ছেলে মাসুদ। তাদের নির্ধারিত টাকা না দিলেই ব্যবসায়ীদের মারপিট, দোকান ভাংচুর, লুটপাট, টাকা ছিনতাইসহ দখলদারিত্ব চালাচ্ছে।


তেতুলিয়া বাগেরহাট বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আমিন উদ্দিন বলেন, সরকারের নির্ধারিত চেয়ে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করছে ইজ্জতদারা। তাদের বেঁধে দেওয়া খাজনা না দিলে মারপিটসহ বিভিন্ন রকমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।


প্রতিহাটে ছোট বড় সকল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৭০ টাকা হারে খাজনা নেয়া হচ্ছে। তরকারি ব্যবসায়ী আব্দার আলী বলেন, এসি ল্যান্ড সাহেব এসে আমাদের ৫০ টাকা করে খাজনা দিতে বলেছে। কিন্তু যারা খাজনা তুলছে তারা জোর পূর্বক ৭০ টাকা করে নিচ্ছে।


তিনি বলেন, হাটের দিন কেউ হাটে দোকান না বসালেও পরের হাটে সব খাজনা পরিশোধ করতে হয়। তিনি বলেন, তার ছোট ভাই আরশাদ আলী দীর্ঘদিন রোগে আক্রান্ত ছিলো। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।


অনেক দিন দোকান খুলতে পারেনি। মারা যাওয়ার পর ইজ্জতদার সাঈদ ওরফে জাহিদ তার চাচা হালিম ও চাচাতো ভাই মাসুদ দোকান ভেঙে জোর পূর্বক খাজনা বাবদ মালামাল নিয়ে যায়। এদের কোন বিচার হয়নি।


আব্দার আলী বলেন, বাজারের রমজান স্টোরের মালিক তার দোকানের ফ্লোর পাকা করছিল। এসময় সন্ত্রাসীদের নিয়ে এসে পাকা করণের কাজ বন্ধ করে দেয়। পরে ১০ হাজার টাকা নিয়ে পাকা করণের কাজ করতে দেয়। শুধু তাই নয়, তার বাবা বাজারের হাট ইজারায় অংশ নেওয়ায় তার কাছ থেকে ২ হাজার টাকা চাঁদা নেয়। বাজারের প্রতিবন্ধী ফল ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বলেন, বাজারের গ্রাম্য চিকিৎসক আব্দুর রহমান তার ঘরের কোনে আমাকে ফল বেচাকেনা করার জন্য বসতে দিয়েছে।


কিন্তু বাজারের ইজ্জতদারদের খাজনা না দেওয়ায় তার ফলের ঝুড়ি পাশের পুকুরে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেয়। স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির বাসায় থাকার কারণে সাঈদ ওরফে জাহিদের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বলতে সাহস পায় না। মুদি ব্যবসায়ী নূর আলী বলেন, তিনটি রশিদে খাজনা তোলে। অনেক সময় রশিদ ছাড়াই খাজনা তোলা হয়। আবার রশিদ না থাকলে রশিদ নিয়ে আসার কথা বললেই হুমকি দেওয়া হয়।


পুলিশের ভয় দেখানো হয়। তরকারি ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন বলেন, ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকা এখন ৭০ টাকা হারে খাজনা আদায় করা হচ্ছে। এভাবে খাজনা নিলে দোকান বন্ধ করে বাড়ি বসে থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। তরকারি ব্যবসায়ী দবির উদ্দিন বলেন, শরীর খারাপ হলে কোন দিন দোকান না খুললে পরের হাটে এসে টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে মারপিটসহ গালিগালাজ ও হুমকি দেয়া হয়।


মুদি ব্যবসায়ী জামিনুর রহমান বলেন, গত হাটে একশ’ টাকার একটি নোট দিয়েছি, ২০ টাকা ফেরত দিয়ে ৮০ টাকা নিয়ে গেছে। ৮০ টাকা কেন নিলে জানতে চাইলে হুমকি দিয়ে বলে ৮০ টাকা খাজনা।


হাট ইজারার বিষয়ে জানতে চাইলে সোলাইমান খান র‌্যাফেল বলেন, বাগেরহাট বাজার আমার না। আমার তেতুলিয়া হাট। অতিরিক্ত খাজনা নেওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদ ওরফে সাঈদ বলেন, রাজারের ইজারাদার সোলাইমান খান র‌্যাফেল। সে লোক ঠিক করে দিয়েছে, তারাই টাকা তোলে। টাকা তোলে আমার চাচা হালিম জমাদ্দার ও তার ছেলে মাসুদ।


শাসক দলের জনপ্রতিনিধির পিএস পলাশ বলেন, সারা দেশের মানুষ জানে যশোর সদর আসনের জনপ্রতিনিধির রাজনৈতিক একজন মাত্র পিএস। সেটি আমি একাই। এর বাইরে কোন পিএস নেই।


এমপি সাহেবের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপকর্ম করলে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। শীর্ষ জনপ্রতিনিধির উপদেষ্টা সুজন সাত্তার বলেন, আমি খোঁজখবর নিচ্ছি। যদি কেউ কারো নাম ভাঙিয়ে কোন অনিয়ম করে তাহলে তাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।


নির্ধারিত খাজনার চেয়ে অতিরিক্ত খাজনা আদায় সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) জাকির হোসেন বলেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংযুক্ত থাকুন