শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১
Logo
প্রাণঘাতী মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ

প্রাণঘাতী মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ

স্থল-আকাশ ও নদী পথে আসছে মাদক, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার পাচারের প্রধান রুট , যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য-অস্ট্রেলিয়া-ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে , আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী মাফিয়া ডন ও গডফাদাররা প

বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোকেন, এ্যামফিটামিনক, ইয়াবা, হেরোইন, ফেনইথাইলামিনসহ মূল্যবান প্রাণঘাতী মাদকের চালান আটক হচ্ছে। অথচ ওসব মাদক এদেশে উৎপন্ন হয় না।


মূলত মিয়ানমার, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ওসব মাদক এদেশে আসছে। আর ওসব মাদক চালানের গন্তব্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।


আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিরা বাংলাদেশকে মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও পুলিশ সদর দফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।


সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ৫ বছরে দেশে প্রায় অর্ধশতাধিক কোকেন, এ্যামফিটামিনক, ইয়াবা, হেরোইন, ফেনইথাইলামিনসহ মূল্যবান ও প্রাণঘাতী বড় ধরনের মাদকের চালান আটক হয়েছে। আটককৃত মাদকের চালানের মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। আকাশ পথে ও নদী পথে ও স্থল বন্দর দিয়ে ওসব মাদকের চোরাচালান বাংলাদেশে আসে।


আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী মাফিয়া ডন ও গডফাদাররা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে মাদক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ মাদকের চালান আটক হলেও তার সাথে জড়িত আন্তর্জাতিক মাফিয়া ডন বা গডফাদাররা ধরা পড়েনি। শুধুমাত্র বাহক ধরা পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে সাক্ষ্য, প্রমাণের অভাবে আটক করা মাদকের চালানের মামলায় বাহক শ্রেণীর মানুষকেই আসামি করে অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দেয়া হচ্ছে।


সূত্র জানায়, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ নয়। কিন্তু মাদক পাচারকারীরা ট্রানজিট রুট হিসেবে এ দেশকে ব্যবহার করছে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে মাদকের বিস্তার রোধ করা ছাড়া বিকল্প নেই। ইরান, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশ আফিমের একটি বড় বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।


আর দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ায় যতো আফিম আসে তার প্রধান সরবরাহকারী দেশ হচ্ছে মিয়ানমার। তাছাড়া আফগানিস্তান বর্তমান বিশ্বের ৯০ শতাংশ আফিম উৎপাদন করে এবং ৮৫ শতাংশ হেরোইন ও মরফিন তৈরি করে। পাকিস্তান থেকে কুরিয়ারে, ভারত থেকে বাণিজ্যিক মোটরযান ও ট্রেনে এবং মিয়ানমার থেকে বঙ্গোপসাগর দিয়ে অথবা ট্রাক ও পাবলিক পরিবহনে করে বাংলাদেশে মাদক আনা হয়।


চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েও বাংলাদেশ থেকে অধিকাংশ মাদক চালান অন্যান্য দেশের উদ্দেশে পাচার হয়। ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ দল ও সিভিল এভিয়েশন যৌথ টিম সম্প্রতি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদিগামী গার্মেন্টসের রফতানি পণ্য চালানের ৩টি কার্টন থেকে ৩৮ হাজার ৯শ’ পিস ইয়াবা জব্দ করেছে। সেগুলোর বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ টাকা।


গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ইয়াবার ওই চালান জব্দ করা হয়। বিল অব এক্সপোর্ট অনুযায়ী পণ্য চালানের রফতানিকারক এমএস সিয়াম এ্যান্ড সমি এন্টারপ্রাইজ এবং ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে খিলগাঁও পশ্চিমপাড়া। আর আমদানিকারক হিসেবে লেখা রয়েছে সৌদি আরবের এ্যাপারিজ ইন্টারন্যাশনাল ইস্ট, যেখানে ঠিকানা দেয়া হয়েছে রিয়াদের আল ওয়াজির ট্রেডিং সেন্টার। আটককৃত ইয়াবা সৌদি আরবে পাচার করা হচ্ছিল।


আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীর সঙ্গে কারা কিভাবে জড়িত সে বিষয়ে তদন্ত করে বের করার চেষ্টা চলছে। সূত্র আরো জানায়, ইতিপূর্বে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১২ কেজি ৩২০ গ্রাম নতুন মাদক এ্যামফিটামিন উদ্ধার করা হয়েছে।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কর্তৃপক্ষ এ্যামফিটামিনক উদ্ধারের ঘটনায় মোট ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে ১২ কেজি ৩২০ গ্রাম এ্যামফিটামিন পাউডার পাচারের জন্য সীমান্ত এলাকা বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছিল।


ভারত থেকে এ্যামফিটামিন সংগ্রহ করে তৈরি পোশাকের কার্টনের মধ্যে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কার্বনের লেয়ার দিয়ে ক্যাভিটি তৈরি করে ওই মাদকদ্রব্য মালয়েশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল। ওই মাদক চালানের সঙ্গে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তারা ইতিমধ্যে জামিনে বের হয়ে গেছে বলে জানা যায়। গত কয়েক বছরে এদেশে অন্তত ৭টি কোকেনের চালান আটক হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ওসব কোকেন পাচারের জন্য এনেছিল আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্র। কিন্তু শুধুমাত্র বাহকরা ধরা পড়লেও গডফাদাররা ধরা পড়েনি।


ফলে বাহককে আসামি করেই মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দেয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই কোকেনসহ মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে চট্টগ্রাম। কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে সারাদেশে ইয়াবা পাচার হয়। ওই কারণে প্রতিদিনই চট্টগ্রামে ইয়াবা ধরা পড়ছে। দামী মাদক কোকেনও ধরা পড়ছে। গত আগস্টে চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো ফেনইথাইলামিন নামের এক বিশেষ ধরনের মাদক ধরা পড়েছে, যা দেখতে কোকেনের মতো।


তবে সেটি কোকেনের চেয়ে দামী। বিগত ২০১৮ সালের অক্টোবরে ফেনইথাইলামিন মাদকদ্রব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। উদ্ধার হওয়া মাদকের মূল্য ১২ কোটি টাকা। আর চট্টগ্রাম বন্দরে কোকেনের সবচেয়ে বড় চালান ধরা পড়ে। ২০১৫ সালের ৬ জুন ওই ঘটনাটি ঘটে। সূর্যমুখী তেলের চালান জব্দ করে ১০৭টি ড্রামের মধ্যে একটি ড্রামের নমুনায় কোকেন শনাক্ত হয়। জব্দ করা ৩৭০ লিটার কোকেনের মূল্য ৯ হাজার কোটি টাকা। তরল কোকেনকে গুঁড়া বা পাউডার কোকেনে রূপান্তর করার মতো প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি বাংলাদেশে নেই। ওই চালানটি উরুগুয়ের মন্টিভিডিও থেকে জাহাজীকরণ করা হয়। পরে তা সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে।


এদিকে এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে ইয়াবা বা হেরোইন মাদক হিসেবে সেবন করা হয়। কিন্তু কোকেন, এ্যামফিটামিনক বা ফেনইথাইলামিন মাদক বাংলাদেশে সেবনের লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। দু’একজনের সামর্থ্য থাকলেও তারা আসক্ত নয়। ট্রানজিট হিসেবে চট্টগ্রামে কোকেনগুলো আসে। সেখান থেকে অন্য দেশে পাচার হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের গডফাদাররা ধরা ছোয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।


যে কারণে কোন দেশ থেকে কারা কিভাবে বাংলাদেশে মূল্যবান প্রাণঘাতী মাদক আনছে, আবার কোন দেশে পাচার করছে তার বেশিরভাগ মাদক চালানই শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা জানান, মূল্যবান ও প্রাণঘাতী মাদকের চালান পাচারের সঙ্গে মাফিয়া ডন ও গডফাদাররা জড়িত।


কিন্তু তারা ধরা পড়ছে না। ধরা পড়ছে মাদক চালান পাচারের সঙ্গে জড়িত বাহক শ্রেণীর মানুষজন। বাহক শ্রেণীর মানুষজন ধরা পড়লেও সাক্ষ্য, প্রমাণের অভাবে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারো তারা মাদক পাচারের বাহকের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। একবার যারা মাফিয়া ডন বা গডফাদার চক্রের আন্তর্জাতিক পাচারের সদস্য হিসেবে জড়িয়ে পড়েছে, তারা ওই চক্রের জাল থেকে আর বের হতে পারছে না। ওই ধরনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী মাফিয়া ডন ও গডফাদাররা।

সংযুক্ত থাকুন