শনিবার, ০৮ মে ২০২১
Logo
ঝিনাইদহে বেকারত্ব হার মেনেছে সাবেক সেনাসদস্য দম্পতির কাছে

ঝিনাইদহে বেকারত্ব হার মেনেছে সাবেক সেনাসদস্য দম্পতির কাছে

অবসর নিয়ে সরকারি কর্মচারিরা সাধারনত আরাম-আয়েসে জীবন কাটিয়ে দেন। কেউ কেউ আবার সখের কোন কাজকর্ম করে থাকেন। কিন্তু ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত অনারারি ক্যাপ্টেন কেরামত আলি তার উল্টো।

 

তিনি অবসর জীবনে আরাম-আয়েসের বদলে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন মাঠের কাজে। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবদি পড়ে থাকেন মাঠে, চাষ করেন বারোমাসি পেয়ারা, মাল্টা, তরমুজ, গাজরসহ বেশকিছু ফল ও সবজির। সাথী ফসল হিসেবে চাষ করেন একাঙ্গি বা হলুদের। তিনি বিশ্বাস করেননা শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত কোন মানুষের বেকার জীবনযাপন শব্দটি। সংসার জীবনেই শুধু নয়, সার্বক্ষণিক কাজে সাথী পেয়েছেন সহধর্মিনী হোসনে আরাকে যিনি কাজের ক্ষেত্রে কেরামত আলিকে অনেকটা ডিঙিয়ে গেছেন। কেরামত আলির সাথে কথা হয় তার নিজের ক্ষেতে।

 

তিনি তার লোকদের নিয়ে বারোমাসি পেয়ার বাগানে মসলাফসল বলে বিবেচিত মাছধরার মসলা একাঙ্গি তুলছিলেন সস্ত্রীক। সুন্দর বাচনভঙ্গীর কেরামত আলি জানালেন, গত বছর মাঝামাঝি সময়ে একটানা বৃষ্টির কারণে তার একাঙ্গি ক্ষেতে পচন বা ধসারোগ দেখা দেয়ার কারণে এবার আশানুুরুপ ফলন না পেলেও ৫২ শতকে বারোমাসি পেয়ারা ও মাল্টার সাথে সাথি ফসল হিসাবে একাঙ্গি লাগান। এবার খরচাবাদে ৩৫ হাজার টাকার মত লাভ থাকবে।

 

রোগবালাই না হলে ওই জমি থেকে তিনি আরও ৩০-৩৫ হাজার টাকা পেতেন। তার মতে ৫২ শতকে বারোমাসি পেয়ারা ও মাল্টা চাষে তার এক লাখ টাকার মত খরচ হলেও ৩ লাখ টাকা লাভ করা কল্পনা প্রসূত নয়। ওই ক্ষেত্রে একাঙ্গির আবাদে মোট খরচের ৬০-৬৫ শতাংশ খরচ ওঠানো সম্ভব। সরকার বিভিন্ন সরকারি-সেরকারি খাতে জনবল নিয়োগ দিয়ে বেকারত্ব কমানোর পরও বিপুল সংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছেনা না এমন মন্তব্য বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত অনারারি ক্যাপ্টেন কেরামত আলি জানান, কোন সুস্থ বা শিক্ষিত মানুষ তিনি যদি সৎ ও সাহসী হন, তার বেকার জীবন যাপনের সুযোগ নেই। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মাটি এতই উর্বর যে, ইচ্ছা থাকলেই যে কেউ কৃষিকাজের মাধ্যমে সৎভাবে জীবনযাপন ও স্বচ্ছলতার স্বাদ পেতে পারেন। তিনি মনে করেন দৃঢ় মনোবল আর প্রত্যয়ী হলে ২ বা ৩ বিঘা জমি লিজ নিয়ে চাষ করেও স্বচ্ছল ও সুন্দর জীবন যাপন সম্ভব।

 

তাছাড়া, ডেইরী, পোল্ট্রি, হ্যচারি ইত্যাদি কাজতো আছেই। কেরামত আলি মনে করেন জমাজমি বিক্রি করে বা বন্ধক দিয়ে বা ব্যাংক বা কোন অর্থলগ্নিকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশ গিয়ে যে টাকা পাওয়া যায়, সাহসের সাথে চাষাবাদে নামলে যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়, অনেকক্ষেত্রে বিদেশের কথিত চাকরির চেয়ে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বন জোটে। কেননা, আমাদের দেশের অনেক শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত যুবকই বিদেশে ভাল কাজের সংস্থান করতে পারেন না। কেরামত আলির সহধর্মিনী হোসনে আরার অভিমতও প্রায় একই। দু’সন্তানের জননী হোসনে আরা সংসারের সব কাজ দক্ষতার সাথে শেষ করে ছেলেকেও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা বানিয়েছেন, মেয়েটিও প্রতিষ্ঠিত। শুধু স্বামীর সাথে নয়, নিজের মত পথ চলেন দৃঢ় পদক্ষেপে সাহসিকতার সাথে। আশেপাশের নারিদের মাঠের কাজে অংশ নিতে প্রচারণা চালাচ্ছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন।

 

সম্পূর্ণ সফল না হলেও নিরাশায় ভোগেন না তিনি। তাদের নিয়ে সমাজে প্রচলিত নারিবান্ধব কিছু কাজ করছেন তিনি। নারিদের স্বাবলম্বী করতে রান্নার চাল থেকে “মুষ্টির চাল” সংগ্রহ করে সমাজকল্যাণ মূলক কাজ করছেন এলাকায়। ভিক্ষুকদের নিয়েও কাজ করছেন অভিশপ্ত ওই পেশা থেকে তাদের পরিত্রাণ দিতে। কেরামত আলি ও হোসনে আরা দুজনই বিশ^াস করেন সবুজ-শ্যামল বাংলায় কৃষিকাজের চেয়ে সম্মানজনক ও লাভজনক কোন সৎ ব্যবসা নেই। কেননা কৃষকের প্রতিটি ফসলই এখন লোকসানের ধকল কাটিয়ে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে, কৃষি ও কৃষক এখন আর অসম্মানের নয়, সমাজ ও দেশের জন্য গর্বের।

সংযুক্ত থাকুন