মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১
Logo
চোখে ধুলো দিয়ে চুড়ামনকাটিতে কথিত চিকিৎসক জাহিদুল কোটিপতি

চোখে ধুলো দিয়ে চুড়ামনকাটিতে কথিত চিকিৎসক জাহিদুল কোটিপতি

স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানে অপকর্ম ফাঁস

অবৈধভাবে বিদেশী ওষুধ বিক্রি ও আকু পাংচার ও এনালাইজার মেশিনে পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে মানুষকে বোকা বানিয়ে হাতানো অর্থে যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের বাদিয়াটোলার কথিত চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম কোটিপতি বনে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

তার চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের অভিযানের পর স্বল্প সময়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার নেপথ্যে কারণ ফাঁস হয়। অভিযানের সময় প্রতারণা বন্ধে এক সপ্তাহের আল্টিমেটাম দেয়া হলেও কর্মকান্ড থেমে নেই জাহিদুল ইসলাম। নির্বিঘ্নে কর্মকান্ড চালাতে তিনি তদবির মিশনও চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

জানা গেছে, বাদিয়াটোলা গ্রামের নাছির উদ্দিনের ছেলে জাহিদুল ইসলাম নিজ বাড়ির সামনে সেবা হোমিও হল নামে একটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে জাহিদুল ইসলামের চিকিৎসাসেবার অন্তরালে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছেন। আকু পাংচার ও এনালাইজার মেশিনে পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে মানুষকে বোকা বানিয়ে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য করছেন তিনি। এছাড়া বিদেশী ওষুধ বিক্রি করেন।

 

সূত্র জানায়, জাহিদুল ইসলাম ২০১৮ সালে খুলনার ইউনানী মেডিকেল কলেজ থেকে ডিইউএমএস পাশ করেন। সেই হিসেবে তিনি একজন ইউনানী চিকিৎসক। অথচ তিনি ইউনানীর পাশাপাশি হোমিওপ্যাথ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ছাড়াও দেশী বিদেশী নানা ধরনের ওষুধ বিক্রি করছেন। তার চেম্বারের পিছনের ঘরটি দেখে মনে হবে ওষুধের গোডাউন। এছাড়াও জাহিদুল ইসলাম নামের পরে বিএইচবি (কলিকাতা) নামে একটি ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। বাস্তবে সেটা ডাক্তারী কোন ডিগ্রি না। রোগীদের আগ্রহ বাড়াতে ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করছেন। এভাবে মানুষ ঠকিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তিনি স্বল্প সময়ে কোটিপতি বনে গেছেন। বাদিয়াটোলা গ্রামে তৈরি করেছেন দুইতলা আলিশান বাড়ি। হৈবতপুর ইউনিয়নের নাটুয়াপাড়া গ্রামে ক্রয় করেছেন ১২ বিঘা জমি। যশোর শহরের উপশহর এলাকায়ও তার ৪ তলার একটি আলিশান বাড়ি রয়েছে। বিভিন্ন মাঠে লাখ লাখ টাকার জমি বন্ধক নেয়া আছে তার।

 

স্থানীয় একজন ভ্যান চালক জানান, এক সময় জাহিদুল ইসলামের ভিটে বাড়ি ছাড়া কোন সম্পদ ছিলো না। তিনি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছেন। চিকিৎসকের সাইনবোর্ড ঝোলানোর পর থেকে ভাগ্যের উন্নয়ন হতে থাকে। এখন তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক। নামে বেনামে অনেক সহায় সম্পদ রয়েছে তার। কয়েকটি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। সেবা হোমিও হলে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জাহিদুল ইসলাম রোগী প্রতি ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেন। এরমধ্যে চিকিৎসকের ফিস, আকু পাংচার ও এনালাইজার মেশিনে রোগ নির্নয় এবং ওষুধের দাম ধরে এই টাকা নেন।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাহিদুল ইসলাম হৃদরোগ, ক্যান্সার, ব্রেন স্টোক, কিডনী জনিত সমস্যাসহ সর্বরোগের চিকিৎসক সেজে রোগীর ব্যবস্থাপত্র দেন। আবার বিনা অপারেশনে যেকোন জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা মেলে তার কাছে। এছাড়া নিঃসন্তান দম্পতিদের স্পেশালভাবে টিটমেন্ট করেন তিনি।

 

অভিযোগ উঠেছে, অর্থ আয়ের ধান্দায় জাহিদুল ইসলাম সব রোগের চিকিৎসক সেজে প্রতারণা করে চলেছেন। এদিকে, গত ১৫ এপ্রিল সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীর আবু মাউদের নেতৃত্বে জাহিদুল ইসলামের সেবা হোমিও হলে অভিযান চালানো হয়। এসময় তার বিভিন্ন অনিয়ম ও প্রতারণার প্রমান মেলে। পরে চিকিৎসা প্রতারণাসহ বিভিন্ন অনিয়ম সংশোধন করার জন্য জাহিদুল ইসলামকে ৭ দিনের সময় বেধে দেয়া হয়। কিন্তু জাহিদুল ইসলামের প্রতারণা ও অনিয়ম থেমে নেই। তিনি সব ধরণের চিকিৎসা প্রতারণা, আকু পাংচার ও এনালাইজার মেশিনে রোগীর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে পরীক্ষা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে একটু গোপনীয়তা রক্ষা করছেন।

 

এই বিষয়ে জাহিদুল ইসলাম জানান, নাটুয়াপাড়া জমি ক্রয় এটা সত্য। তবে ১২ বিঘার কম। যশোর শহরে আলিশান বাড়ি নেই। শুধুমাত্র বাদিয়াটোলা গ্রামে একটি বাড়ি আছে। তিনি জানান, আকু পাংচার ও এনালাইজার মেশিনে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন না। তাকে নিয়ে বিভিন্ন মিথ্যাচার করা হচ্ছে।

 

যশোর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মীর আবু মাউদ জানান, অভিযানের সময় কথিত চিকিৎসক জাহিদুল ইসলামের নানা প্রতারণা ও অনিয়মের সত্যতা মেলে। আকু পাংচার ও এনালাইজার মেশিন ব্যবহার না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো। প্রথমবার মানবিক কারণে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে সংশোধনের জন্য ৭ দিনের আল্টিমেটাম দেয়া হয়। সেবা হোমিও হলে আবারো যে কোন দিন অভিযান পরিচালনা করা হবে। তখন অনিয়ম ও প্রতারণার সত্যতা পেলে জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংযুক্ত থাকুন