বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১
Logo
খুলনা-সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে নির্বাচনী সহিংসতা

খুলনা-সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে নির্বাচনী সহিংসতা

ইউপি নির্বাচন

আসন্ন ১১ এপ্রিল প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা দেখা দিয়েছে। হামলা, ভাংচুর ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ।


প্রশাসন নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তথাপি এসকল সহিংসতায় ভোটারদের মাঝে উৎকন্ঠা বাড়ছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট :

পাইকগাছা সংবাদদাতা জানান, পাইকগাছায় ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রার্থীসহ দু’পক্ষের কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছে। আহতদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার সকাল ১০টার দিকে ইউনিয়নের বেতবুনিয়া মাদ্রাসা মোড় এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।


এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, এসিল্যান্ড, ওসি, ডিবির ওসি ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৪ জনকে আটক করেছে।

 

জানাগেছে, আগামী ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য সোলাদানা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতিক নিয়ে নির্বাচন করছে আওয়ামীলীগ নেতা ও সদ্য সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য আব্দুল মান্নান গাজী। অপরদিকে আনারস প্রতিক নিয়ে নির্বাচন করছে উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম আহবায়ক ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান এসএম এনামুল হক।


এলাকাবাসীর সুত্রমতে অত্র ইউনিয়নে একাধিক প্রার্থী থাকলেও মুল প্রতিদ্বন্ধিতা হবে এসএম এনামুল হক ও আব্দুল মান্নান গাজীর মধ্যে। যার ফলে নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে দু’প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা নির্বাচনী মাঠে প্রাণপন চেষ্ঠা করছেন। শনিবার সকাল ১০টার দিকে বেতবুনিয়া মাদ্রাসা মোড় এলাকায় দু’প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা সমবেত হলে সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নৌকা প্রতিকের প্রার্থী আব্দুল মান্নান গাজী জানান-আমার কর্মী সমর্থকরা আগে থেকেই বেতবুনিয়া মাদ্রাসা মোড় এলাকায় অবস্থান করছিলো, হঠাৎ আনারস প্রতিকের প্রার্থী এসএম এনামুল হক তার লোকজন নিয়ে আমার কর্মী সমর্থকদের উপর হামলা করে। এতে আফজাল হোসেন, রবিউল ইসলাম, সালাউদ্দিন, রমজান সরদার, মুসা, আব্দুস সাত্তার, ফিরোজ, বারিক, আতিয়ার, নূর ইসলাম, ইয়াছিন ও নেছারসহ কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ জন কর্মী আহত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে আসলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।


তা না হলে আমাদের অনেকের প্রাণহানী ঘটতে পারতো। অপরদিকে আনারস প্রতিকের প্রার্থী এসএম এনামুল হকের কর্মী টেংরামারি এলাকার সুশংকর মন্ডল জানান প্রার্থী এনামুল হককে নিয়ে আমরা বেতবুনিয়া মাদ্রাসা মোড় এলাকায় পোষ্টার লাগাতে গিয়েছিলাম এসময় ওখানে অবস্থানরত নৌকা প্রতিকের কর্মী সমর্থকরা আমাদের উপর চড়াও হয়ে মারপিট শুরু করে।


এতে আমাদের প্রার্থী এনামুল হক আমি সুশংকর মন্ডল, কালিপদ মন্ডল, কিশোর ও সুকৃতিসহ কয়েকজন আহত হয়। এ ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার ইকবাল মন্টু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী, এসিল্যান্ড শাহরিয়ার হক, ওসি এজাজ শফি ও ডিবি ওসি আমিনুল ইসলামসহ থানা ও ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে লোকজনকে ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। দুপুর দেড় টার দিকে ইউপি চেয়ারম্যান এসএম এনামুল হককে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় নেয়া হয়। এ ব্যাপারে ওসি (তদন্ত) আশরাফুল আলম জানান প্রশাসন ও পুলিশ যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়।


এসময় ঘটনাস্থল থেকে প্রাথমিকভাবে ৪ জনকে আটক করার কথা জানান থানা পুলিশের এ কর্মকর্তা। দিঘলিয়া সংবাদদাতা জানান, গত ২৬ মার্চ দিঘলিয়ার বারাকপুর ইউনিয়নে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।


জানা যায় আসন্ন বারাকপুর ইউনিয়ন নির্বাচনকে ঘিরে চেয়ারম্যান প্রার্থী আলহাজ্ব গাজী জাকির ও শেখ আনছার আলীর সমর্থকদের মাঝে শুক্রবার সন্ধ্যায় নন্দন প্রতাপ এলাকায় সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে বারাকপুর বাজারে দোকান ভাংচুর হয়। এবং চলতে থাকে সংঘর্ষ।


এ সংবাদ পেয়ে দিঘলিয়া থানা পুলিশ এবং ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রনে আনে। সংঘর্ষে কয়েকটি মটর সাইকেল, বেশ কয়েকটি দোকানসহ বাড়ী-ঘর ভাংচুর করা হয়। সংবাদ পেয়ে ছুটে আসে দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহি অফিসার মোঃ মাহাবুবুল আলম। দিঘলিয়া থানা অফিসার ইনচার্জ আহসান উল্লাহ চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এবং বিক্ষুব্দ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।


এ সময়ে মারাত্মক জখম অবস্থায় মোঃ আজাদ, মোঃ সাহিদুল ও সোহেলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তৎক্ষনিক ভাবে আহতদের দেখতে যান চেয়ারম্যান আলহাজ্ব গাজী জাকির হোসেন। বর্তমানে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পূলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।


মামলার প্রস্তুতি চলছে। তালা সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নে নৌকা প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা আনারস প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীদের উপর হামলা চালিয়েছে। এসময় দোকান ঘর ভাঙচুর ও মহিলাসহ ৫ জন কর্মীকে পিটিয়ে আহত করেছে। বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার জালালপুর শ্রীমন্তকাটি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহতরা সকলে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আহতরা হলেন, শ্রীমন্তকাটি গ্রামের আক্কাজ শেখের ছেলে আলাউদ্দীন শেখ (৫০), হানেফ শেখের ছেলে মহিদ শেখ (৪৯), হযরত আলী শেখের ছেলে রবিউল সরদার (৪০) ও হানেফ সরদারের ছেলে সিরাজ সরদার (৫৫), রহিম গাজীর স্ত্রী বাবু নাহার (৫৫)।


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কৃষ্ণকাটি-রথখোলা এলাকায় আনারস প্রতীকের কর্মী সমাবেশে যাওয়ার পথে জালালপুর এলাকায় নৌকার কর্মী সমর্থকরা আনারস সমর্থীত ৯ কর্মীকে পিটিয়ে আহত করে। এরমধ্যে ৪ জন গুরুত্বর আহত হওয়ায় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে তালা হাসপাতালে ভর্তি করেন। অন্যদিকে নতুন বাজারে নৌকা সমার্থন মিছিল থেকে রহিম গাজীর স্ত্রী বাবু নাহার এর ছেলেকে দোকানে না পেয়ে তার দোকান ভাংচুর এবং নগদ টাকা ও মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এঘটনায় বাবু নাহার গুরুত্বর আহত হয়ে তালা হাসপাতালে ভর্তি আছেন। স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী এম মফিদুল হক লিটু জানান, নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয় জেনে নৌকা প্রার্থীর ক্যাডার তার কর্মীদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। রাতের আধারে পোষ্টার, ব্যানার ছিড়ে ফেলা হচ্ছে এবং এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছে। শান্ত এলাকাকে অশান্ত করে তুলছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।


জালালপুর ইউনিয়নের নৌকার প্রার্থী রবিউল ইসলাম মুক্তি বিষয়টি অস্বীকার করে জানান স্বতন্ত্রী প্রার্থীর কর্মীরা নিজেরাই ঝগড়া করার সময় ভ্যান উল্টে পড়ে আহত হয়। এঘটনায় নৌকা সমর্থক কোন কর্মী জড়িত না।


তালা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মেহেদী রাসেল ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এঘটনার খবর শুনে থানা পুলিশ এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। তবে এখনো কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মোড়েলগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, মোড়েলগঞ্জের ১নং তেলিগাতি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান মোর্শেদা আক্তারের সমর্থীত ৮ নেতাকর্মীকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। এ ঘটনায় শনিবার থানায় মামলা দায়ের হয়েছে। মতিউর রহমান নামের একজন গ্রেফতার হয়েছে। প্রতিবাদে এলাকায় বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।


মামলার বিবরনে জানাগেছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ইউনিয়নের নৌকা প্রতিকের প্রার্থী মোর্শেদা আক্তারের কর্মীরা সভা শেষে পোষ্টার লিফলেট নিয়ে ফেরার পথিমধ্যে এতিমুল্লা নামক স্থানে বিদ্রোহী প্রার্থী নজরুল ইসলাম খানের সমর্থনকারি পিকলু সরদারের নেতৃত্বে ১০/১৫ জনের একটি দল পরিকল্পিতভাবে অর্তকিত হামলা চালায়। এতে তাঁতীলীগ নেতা আঃ হালিম খান(৩৫), যুবলীগ নেতা মনিরুল ইসলাম শেখ (৩২), সলেমান খান (৪০), আবুল কালাম শান্ত(৪০), হানিফ খান (৩৮), উজ্জল শেখ (২০), মনিরুল ইসলাম (৪০), মো. মিরাজ হোসেন(৩২) কে পিটিয়ে কুপিয়ে গুরুত্বর জখম করে। হামলাকারিরা এ সময় ৭/৮টি মোটরসাইকেল ভাংচুর করে। তাৎক্ষনিক ওই রাতেই জখমীদের উদ্ধার করে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে গুরুত্বর জখম আঃ হালিম খানের অবস্থা আশংকাজনক।


এ ঘটনায় মোর্শেদা আক্তার বাদি হয়ে পিকলু সরদারকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে। এ দিকে এ হামলাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমুলক বিচারের দাবিতে শনিবার সন্ধ্যায় তেলিগাতি বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসি।


প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদিকা চেয়ারম্যান মোর্শেদা আক্তার, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হেদায়েত আলী খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান নকিব, ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান অপু, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী শারমিন আক্তার শিখাসহ স্থানীয় বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ।

মোর্শেদা আক্তার বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী নজরুল ইসলাম খানের সাথে বহিরাগত জামাত-বিএনপি সমর্থিত লোকেরা পরিকল্পিতভাবে তার নেতাকর্মীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে।


অবিলম্বে হামলাকারিদের গ্রেফতার ও এলাকায় নির্বাচনী সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান। এ সর্ম্পকে থানা অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ওই রাতেই তাৎক্ষনিক পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করে। মতিউর রহমান হাওলাদার নামের একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

সংযুক্ত থাকুন