নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার আগ্রহ কম’

0
30


যশোর অফিস
দেশের আঞ্চলিক সংবাদপত্রের মধ্যে যশোর থেকে প্রকাশিত ‘গ্রামের কাগজ’ বেশ ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পত্রিকাটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। পাশাপাশি সাংবাদিকতায় অবদান রাখায় অর্জন করেছে নানা সম্মাননা-পুরস্কার। পত্রিকাটির সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিনের একনিষ্ঠতায় এটি সম্ভব হয়েছে। একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি শুনিয়েছেন আঞ্চলিক সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার অতীত-বর্তমান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাগো নিউজের যশোর প্রতিনিধি মিলন রহমান।

‘মফস্বল সাংবাদিকতার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে কী ব্যবধান খুঁজে পান? এমন প্রশ্নের জবাবে মবিনুল ইসলাম জানান, যার একটি ফেসবুক আইডি আছে, ইউটিউব চ্যানেল আছে, তারাই সাংবাদিক বনে যাচ্ছে। মফস্বল সাংবাদিকতায় অতীত আর বর্তমানে অনেক ফারাক। আগে যারা সাংবাদিকতা করতেন, সত্যিকার পেশাদারিত্বের প্রতি তাদের মমত্ববোধ ছিল। সেই জায়গা থেকে সাংবাদিকতা অনেকটা সরে এসেছে। এখন অধিকাংশ সাংবাদিক রাজনীতি, ব্যবসা বা অন্যান্য কর্মকা-ে জড়িত। আগে সংবাদপত্রের মালিকরা ছিলেন রুচিশীল, সৃজনশীল এবং সমাজের সচেতন মানুষ। তখন সংবাদপত্রে কাজ করে বিশাল টাকা আয় করতে হবে এমন মানসিকতা ছিল না।

সময়ের প্রেক্ষাপটে বা পরিস্থিতিতে (সাংবাদিকদের) চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু আগে এটি ছিল না, এটিও একটি ব্যবধান। আরেকটি ব্যবধান হচ্ছে, আগে মানুষের কথা বেশি বেশি বলা হতো; সমাজের বিভিন্ন চিত্র ফুটে উঠতো সাংবাদিকতায়। এখন তার সঙ্গে অনেক কিছু (ব্যক্তি স্বার্থকেন্দ্রিক) যুক্ত হয়েছে। আগে মাঠপর্যায়ে যারা সাংবাদিকতা করতো তাদের পেশার প্রতি, লেখার প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল, আগ্রহ ছিল। তারা চেষ্টা করতেন, কষ্ট করতেন; কাজটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। এখন নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার আগ্রহ কম, অলসপ্রবণতা রয়েছে। তারা অল্প পরিশ্রমে, আয়েশে ভালো প্রতিবেদন চান। তারা ফিল্ডে, ঘটনাস্থলে যেতে আগ্রহ দেখায় না। অনেকটা দায়সারা গোছের সাংবাদিকতাও করেন অনেকে। কিন্তু এর মধ্যে যারা ভালো করছেন তারা এগিয়ে যাচ্ছেন।

মফস্বল সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মফস্বল সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নিতে পত্রিকার সম্পাদক বা প্রকাশক এবং যারা সিনিয়র সাংবাদিক তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। নতুন প্রজন্ম যারা আসছেন তাদেরকে সাংবাদিকতা যে চ্যালেঞ্জিং পেশা, সৃজনশীল কাজ এটি বোঝাতে হবে। যারা সংবাদপত্রে সাংবাদিক নিয়োগ দেবেন তাদেরকেও ওই জায়গাটিতে সচেতন হতে হবে। আমরা কাদেরকে নির্বাচিত করছি; শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের নিচ্ছি; না ভবঘুরে টাইপের ছেলেমেয়েদের নিচ্ছি। সেটা বাছাই একটি ব্যাপার; দেখেশুনে বুঝেই নিতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, প্রশিক্ষণ। এর বিকল্প নেই, তাই প্রশিক্ষণের ধারাটি অব্যাহত রাখতে হবে।

সাংবাদিকতায় নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে; নতুন নতুন আইটেম হচ্ছে, নতুন ধারা সূচিত হচ্ছে; সেখানে মান্ধাতার আমলের বিষয়ে আটকে থাকলে হবে না। নতুন নতুন বিষয় সংযুক্ত করতে হবে। দেশে অনেক নতুন নতুন আইন হচ্ছে, এগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন কাজ করতে পারে, সেভাবেই সাংবাদিকদের তৈরি করতে হবে। পানের দোকানদার, চাল ব্যবসায়ী বা অনেক ছোটখাটো ব্যবসায়ী বা টাউট বাটপার পর্যন্ত পত্রিকার মালিক হয়ে যাচ্ছে। অপর এক প্রশ্নের জাবাবে তিনি জানান, আঞ্চলিক সংবাদপত্রগুলো অতীতে কেবল আঞ্চলিক রিপোর্টে প্রাধান্য দিতো বা স্থানীয় নানা বিষয় তুলে ধরতো। তখনকার প্রেক্ষাপট এমনই ছিল যে, স্থানীয় সমস্যা, সম্ভাবনা, মানুষের সুখ-দুঃখের কথা বা মানুষের সাফল্যের কথা তুলে ধরা হতো। এখন যুগ পাল্টেছে, পাঠকদের চাহিদাও পাল্টেছে। এখন পাঠক আঞ্চলিক পত্রিকাতেই সারা দুনিয়ার খবর চায়।

স্থানীয় পর্যায়ের খবর যেমন দেখতে চায়, তেমনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবরও দেখতে চায়। এসব মিলিয়েই পত্রিকাকে সাজাতে হয়। ফলে পরিস্থিতিগত কারণে, সময়ের প্রয়োজনে অতীতের সঙ্গে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আগে সাংবাদিকতায় দরদ ছিল; সাংবাদিকতা, পত্রিকার মর্যাদা ছিল। এখন এই জায়গাটি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই যারা পত্রিকার মালিক হচ্ছেন, তারা উপযুক্ত ব্যক্তি নন। আমাদের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট-৭৩; যেটি ডিক্লিয়ারেশন দেওয়ার ক্ষেত্রে ফলো করা হয়, সেটিও যদি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় তাহলেও মালিক বা সম্পাদক হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্যদের ঠেকানো যায়। এগুলো একসময় কড়াকড়িভাবে দেখা হতো।

কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, পানের দোকানদার, চাল ব্যবসায়ী বা অনেক ছোটখাটো ব্যবসায়ী বা টাউট বাটপার পর্যন্ত পত্রিকার মালিক হয়ে যাচ্ছে এবং পত্রিকাটি অপকাজে ব্যবহার হচ্ছে। অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে সাংবাদিক সংগঠন ভূমিকা নিতে পারে। এটি করতে পারলে পেশার মর্যাদা সমুন্নত থাকবে। তাছাড়া নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও যারা ভালো করবে তারা ভালোর দিকে যাবে, প্রতিষ্ঠিত থাকবে। সমাজে যাদের রেপুটেশন আছে তাদের সংযুক্ত করতে হবে। এছাড়া সাংবাদিকদের অনেক সংগঠন আছে। স্থানীয় প্রেস ক্লাব আছে, ইউনিয়নের অনেকগুলো সংগঠন আছে। যারা অপসাংবাদিকতা করে, যারা বিতর্কিত তাদেরকে প্রতিরোধে সংগঠনগুলো ভূমিকা নিতে পারে। এটি করতে পারলে পেশার মর্যাদা সমুন্নত থাকবে। আর শুধু অনলাইন নয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন সাংবাদিকের ছড়াছড়ি।

যার একটি ফেসবুক আইডি আছে, ইউটিউব চ্যানেল আছে, তারাই সাংবাদিক বনে যাচ্ছে। বেসিক সাংবাদিকতার সঙ্গে এর অনেক তফাৎ আছে। যারা প্রকৃত সাংবাদিকতা করেন, তাদের সীমাবদ্ধতা দায়বদ্ধতা আছে। একটি সংবাদের সম্পাদনা হয়; সংবাদটিতে সমাজে কী ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হতে পারে মিডিয়াহাউজ বা সাংবাদিকরা কিন্তু সে সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু ফেসবুক বা ইউটিউব চ্যানেলে যারা সাংবাদিকতা করেন, তাদের এই জ্ঞানও নেই, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা ইচ্ছা তাই লিখতে পারেন। এতে সাংবাদিকতা অনেকাংশ প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে, বিতর্কিত হচ্ছে। অনেকে গুলিয়ে ফেলছেন যে, সাংবাদিকতা তাহলে মনে হয় এই রকম! এ বিষয়ে আইন আসলে একটি বড় ব্যাপার। দেশে এ বিষয়ে যে আইন হয়েছে, তার যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে আইনের কড়াকড়িতে এগুলো বন্ধ হতে পারে।

এছাড়া এরই মধ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনলাইন পোর্টালগুলোর রেজিস্ট্রেশন শুরু হয়েছে। রেজিস্ট্রেশনের বাইরে যারা থাকবে এবং যারা বিতর্কিত কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিলেই এটি বন্ধ করা সম্ভব। এছাড়া এখন বিশ্বব্যাপী প্রিন্ট মিডিয়ার পাঠক কমছে। আঞ্চলিক পত্রিকা বরাবরই সংকট ও বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে চলছে। কিন্তু এরপরও স্থানীয় সমস্যা, সংকট, সম্ভাবনার খবরের চাহিদাও বাড়ছে। এজন্য পত্র-পত্রিকাগুলো এখন ডিজিটাল প্লাটফর্মের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

ডিজিটাল প্লাটফর্মে ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে সংবাদবিষয়ক কর্মকা- প্রসারিত করছে। এর প্রয়োজনও রয়েছে। এটি যত শক্ত হবে; আমরা আর্থিকভাবে হয়তো একটি শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারবো। সেটি সম্ভব হলে সাংবাদিকরা উপকৃত হবে; প্রতিষ্ঠানও টিকে থাকবে। ডিজিটাল প্লাটফর্মেও পত্র-পত্রিকাগুলো নিয়ম নীতি মেনে অনেক কনটেন্ট তৈরি করছে, অনেক ভালো ভালো স্টোরি হচ্ছে, যেগুলোর অনেক ভিউ হচ্ছে, পাঠকদের কাছে সমাদৃত হচ্ছে। এটিও টিকে থাকার একটি উপায়।

Comment using Facebook