সাতক্ষীরা সীমান্তে সক্রিয় চোরাকারবারীরা, হুন্ডিতে যাচ্ছে টাকা

0
30

হাফিজুর রহমান, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরা সীমান্তে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে নদীপথে পলিব্যাগে ভাসিয়ে ভারতীয় নি¤œমানের গলদা রেণু দেশে আনছে চোরাকারবারীরা। চোরাই পথে আনা এসব রেণু উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। মার্চ মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত সাতক্ষীরার দেবহাটা, কালিগঞ্জ, শ্যামনগর, কলারোয়া ও ভোমরা সীমান্ত দিয়ে মৌসুমে রেণু পোনা চোরাচালানিতে অন্তত শত কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। বিপুল এই অর্থ মধ্যস্বত্বভোগী হয়ে অবৈধভাবে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে ভারতে। এতে যেমন ব্যাহত হচ্ছে দেশীয় গলদার উৎপাদন তেমনি রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এছাড়া বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের বাগদা ও গলদা চিংড়ির বাজারের সুনামও নষ্ট করা হচ্ছে। গোপন সূত্রে জানা গেছে, চোরাকারবারীরা কলারোয়া উপজেলার দেয়ারা, ভাদিয়ালি, কেড়াগাছী, তলুইগাছা সীমান্ত এবং দেবহাটা উপজেলার নাংলা, ভাতশালা, খানজিয়া, পারুলিয়ার খেজুরবেড়ী ও সদরের ভোমরা, গয়েশপুর, বৈকারী সীমান্ত দিয়ে রেণু পোনা, মাদকসহ অবৈধ ভারতীয় চোরাই পণ্য আমদানির রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। এদিকে কালিগঞ্জ উপজেলার বসন্তপুর, হিঙলগঞ্জ এবং শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী, রমজাননগর, নুরনগর সীমান্ত দিয়ে রেণু পোনা ও মাদকসহ ভারতীয় অবৈধ মালামালের চোরাই রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারীরা।

সম্প্রতি গত ২৪ মে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর রুট দিয়ে রেণু আমদানির সময় বিজিবির অবস্থান বুঝতে পেরে চোরকারবারীরা ৫টি বস্তায় ২৫ পলি রেণু পোনা ফেলে পালিয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট বিজিবি কর্মকর্তারা ওই রেণুর বাজার মূল্য ধরে ১১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা। এরপর গত ৩০ মে কৈখালী তিন নদীর মুখ থেকে ১২জন মানুষকে আটক করে বিজিবি।

এছাড়া ওইদিন ৪টি ভারতীয় গরু ও ১৪০ বস্তা পাতার বিড়ি আটক করে বিজিবির সদস্যরা। অপরদিকে ৩১ মে সুন্দরবনের মামুন্দ খাল থেকে চারটি ভারতীয় গরু ও এক বস্তা ভারতীয় পাতার বিড়ি উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। সূত্র জানায়, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরার এসব সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গলদা রেণু পোনার রমরমা ব্যবসা করছে দেবহাটার শফিকুল হাজী, পারুলিয়া খেজুরবেড়ী এলাকার ছোট জাকির, পারুলিয়া এলাকার হুন্ডি খোকন, নাংলা নওয়াপাড়ার আজগর, নুরুজ্জামান, মালেক, দেবহাটার হুন্ডি আলাউদ্দিন, মামুন হোসেনসহ বেনামি অনেক চোরাচালানিরা। চোরাই পথে আমদানিকৃত এসব রেণু দেবহাটা উপজেলার কুলিয়ার মৎস্য সেটে প্রকাশ্যেই বিক্রি করা হচ্ছে। অভিযোগের হুন্ডি মামুন খ্যাত মো. মামুন হোসেন জানান, ‘তিনি দুই বছর আগেই হুন্ডির ব্যবসা বাদ দিয়েছেন’।

তিনি আরো জানান, ‘ভারতে যে ব্যবসায়ীর সঙ্গে লেনদেন ছিল তিনি মারা গেছে। এজন্য এখন আর হুন্ডির ব্যবসা নেই। তবে তিনি বর্তমানে বৈকারী সীমান্তসহ দেবহাটা ও সদরের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে হাত পলিথিনে অল্প কিছু রেণু পার করে আনেন’। মামুন হোসেন আরো জানান, ‘এখন কুলিয়া সেটে সাতক্ষীরা সীমান্তের রেণু খুব কম আসছে। দিন প্রায় ১লাখের মত সাতক্ষীরা সীমান্তের রেণু কুলিয়া সেটে ওঠে। এছাড়া দেশের অন্যান্য বর্ডার থেকে কিছু মাছ আসে যা কুলিয়া সেটে বিক্রি হয়’। এ বিষয়ে অন্যান্য নামধারী ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তাদের নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে চোরাই পথে গলদা রেণু আমদানির বিভিন্ন রুটে পাচিং ম্যান (পাচারকারী) হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করে আসছেন ভোমরা গয়েশপুর এলাকার কবীর হোসেন, আনারুল ইসলাম, দেবহাটা নাংলা এলাকার মালেক, শাখরা কোমরপুর এলাকার একজন জনপ্রতিনিধিসহ আরো কয়েকজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ীরা জানান, ভারত থেকে চোরাই পথে প্রতিরাতে সহ¯্রাধিক পলিব্যাগে করে রেণু পোনা নদী দিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে আসা হয়। যার মূল্য কমপক্ষে অর্ধকোটি টাকা। যা স্থানীয় বাজারের চাষিদের কাছে বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দামে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেবহাটা এলাকার বাসিন্দা ভারতীয় একজন রেণু ব্যবসায়ী জানান, ‘১২ থেকে ১৫ হাজার পোনাসহ অক্সিজেন ভরা প্রতি পলিব্যাগ কেনা হয় ৩ হাজার রূপিতে। ওই একই রেণু দেশীয় বাজারে বিক্রি হয় কমপক্ষে ৪০ হাজার টাকায়’। ভারতে কীভাবে টাকা পাঠানো হয় এমন প্রশ্নের জবাবে ওই ব্যবসায়ী জানান, ‘অবৈধ পথে রেণু আমদানি করতে অবৈধ পথেই হুন্ডির মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা ভারতে টাকা পাঠায়’। তবে স্থানীয় দেশীয় রেণু ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘দেশীয় হ্যাচারির চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে অবৈধ পথে এসব পোনা আসে। এই ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখতে এবং সরকারের রাজস্ব অর্জনে ভারতীয় রেণু পোনা বৈধ পথে আমদানি করলে সরকার রাজস্ব পাবে এবং চোরাকারবার বন্ধ হবে। সাথে সাথে রেণু পোনার আড়ালে দেশে মাদকও নির্মূল করা সম্ভব হবে’। জেলা চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব ডা. আবুল কালাম বাবলা জানান, ‘কুলিয়া সেটে কিছু ভারতীয় গলদা রেণু আসছে। দেশে গলদার উৎপাদন কম হওয়ায় দেশের স্বার্থে প্রশাসন এখানে একটু ছাড় দেয় বলে জানি। তবে এই রেণুগুলো যদি অবৈধ পথে না এসে সরকারিভাবে বৈধ পথে আমদানি করা যায় তাহলে দেশের রাজস্ব বাড়বে এবং ব্যবসায়ী ও মাছ চাষিদের ঝুঁকিও কমবে। তিনি আরো জানান, ‘সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের সাথে আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে আলোচনা করে অচীরেই এ সমস্যার কথা তুলে ধরে সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে’।

সীমান্তে রেণুসহ ভারতীয় অবৈধ মালামাল চোরাচালানের বিষয়ে কথা বলতে বিজিবি ৩৩ ব্যাটালিয়ন এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আল মাহমুদের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও তাঁর নম্বরটি ব্যস্ত পাওয়া যায়। বিজিবির ১৭ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল আসাদ জানান, ‘রেণু বা আমদানি নিষিদ্ধ যে কোন পণ্য আসলে আমরা তা আটক করি। আমাদের নজর এড়িয়ে যদি সামান্য কিছু রেণু আসলেও আমরা রোধ করার চেষ্টা করি’। রেণুর আড়ালে আমদানি নিষিদ্ধ অন্য কোন অবৈধ পণ্য আসতে পারে কি’না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও পর্যন্ত রেণুর সাথে অন্য কোন আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য পাইনি’।

জেলা মৎস্য অফিসার মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘দেশে গলদা রেণুর উৎপাদন কম থাকায় এবং বৈধ পথে আমদানির সুযোগ না থাকায় ব্যবসায়ীরা অবৈধ পথে গলদা রেণু আমদানি করছে। বিষয়টা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন। তবে আমরা উপরমহলে জানিয়েছি দেশের চাহিদা পূরণে যদি বৈধ পথে গলদা রেণু আমদানি করা যায় তাহলে দেশের চিংড়ি খাত আরো সমৃদ্ধ হবে পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব বাড়বে’। তিনি আরো জানান, ‘দেশে গলদা রেণুর চাহিদা আছে। যেহেতু এখনও পর্যন্ত আমরা ভারত থেকে গলদা রেণু আমদানির বিষয়ে সরকারিভাবে কোন অনুমোদন পাইনি, সেহেতু প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো ছাড়া অবৈধ পথে গলদা রেণুর আমদানি বন্ধ করা কঠিন হবে’।

Comment using Facebook