সারাদিন রোজা রেখে সারারাত পানির জন্য সিরিয়াল নগরবাসির!

0
44

বিএম রাকিব হাসান, খুলনা ব্যুরো

চলছে পবিত্র রমজান মাস। সারাদিন রোজা রাখার পর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ছুটতে হচ্ছে খাওয়ার পানির সন্ধানে। অনেকেই অপেক্ষা করে থাকছেন রাত গভীর হওয়ার।

গভীর রাতে নগরীতে হাজার খানেক গভীর নলকূপের মধ্যে হাতে গোনা ১৫-২০ টিতে উঠছে পানযোগ্য পানি। কিন্তু এক কলস পানি তুলতে সময় লাগছে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা। এই পানি সংগ্রহ করতেই পড়ছে লম্বা লাইন। মাঝে মধ্যে বেধে যাচ্ছে তুমুল ঝগড়া।

২০-২৫ জন লাইনে দাঁড়ালেও পানি নিতে পারছেন মাত্র ৭-৮ জন। তাতেই এই ঝগড়া। নগরীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করছে তা ঘরের কাজে কিছুটা চাহিদা মেটাতে পারলেও খাওয়ার পানির চাহিদা মিটছে না। পানির চাহিদা মেটানোর জন্য অনেকেই নিজ উদ্যোগে সাব মার্সিবল বসিয়েছেন।

কিন্তু তাও খুব একটা কাজে আসছে না। গ্রামের মানুষের মতো শহরের মানুষদের এখন দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে দেখা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। নগরীর পিটিআই মোড় এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা লুৎফুল্লাহ, আমেনা বেগম ও তাসলিমা হোসেন বলেন, ওয়াসার পাইপলাইনের পানি পাওয়া খুবই দূরহ একটা বিষয়। যেটুকু পানি পাইপলাইনে আসে তা অনেক বাড়িমালিক মোটর লাগিয়ে আগেভাগেই টেনে নিয়ে যায়। কেনা পানি দিয়ে আর কতটা চলা যায়। টুটপাড়া ঘোষের ভিটা এলাকার বাসিন্দা হরষিৎ দে, পাপিয়া সুলতানা, শরিফা খাতুন, বেলাল হোসেন বাবু বলেন, আমাদের এলাকায় ওয়াসার একটা উত্তোলক পাম্প রয়েছে। যা দিয়ে দিনের মধ্যে প্রায় ১৪ ঘণ্টা পানি উত্তোলন করা হয়। কিন্তু তবুও আমরা পাইপলাইনে খুব বেশি পানি পাই না। তারা বলেন, এই পাম্পের পানি নগরীর মিয়াপাড়া, রূপসা, চানমারী এবং নগরীর টুটপাড়া কবর খানা এলাকা পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়। ফলে আমরা পানি পাই না। এই এলাকায় যতগুলো নলকূপ আছে সবই এখন অকেজো। ফলে খাওয়ার পানির জন্য এক প্রকার যুদ্ধ শুরু হয় গভীর রাতে। এদিকে সুরক্ষা মঞ্চ খুলনার নেতৃবৃন্দ বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ভূগর্ভের পানির স্তর কোথাও কোথাও ২৫ থেকে ৩০ ফুট নিচে নেমে গেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, নগরীর প্রায় ১৬ লাখ নগরবাসীর জন্য প্রয়োজনীয় পানি বিশেষত সুপেয় পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত এই সমস্যা ভয়ানক রূপে দেখা দেয়। যদি বৃষ্টি দেরিতে আসে তাহলে সমস্যা দীর্ঘায়িত হয়। পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশন এবং খুলনা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হলে নগরবাসী স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিল, পানি সমস্যা সমাধান হবে। বিশেষ করে মধুমতি থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি এনে নগরবাসীকে সরবরাহ করার উদ্যোগ নিয়ে অনেক আশাবাদ প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে দেখা গেছ, ওই প্রকল্প নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, উপরন্তু নরগরবাসীকে নোনা ও ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। অথচ ওই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে (ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্ট) বছরের এপ্রিল-মে মাসে পানিতে নোনা উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। বছর দশেকের ব্যবধানে ওই নোনার মাত্রা অনেক বেড়েছে। ওই প্রকল্পের আরও একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা, কিন্তু আমরা সেই লক্ষ্যও অর্জন করতে পারিনি। পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চ খুলনার সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, সামর্থ্যবান নগরবাসী এখন নিজেরা নিজেদের উদ্যোগে সাব-মার্সিবল পাম্প বসিয়ে পানি সমস্যার সমাধান করছেন।

তিনি বলেন, প্রতিনিয়ত পানির স্তর নিচে নামছে। তার ওপর ওয়াসার উত্তোলক পাম্পগুলো দিয়ে প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টা পানি উত্তোলন করায় সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করছে। পানি ধরে রাখার আধারগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়াই মূল সমস্যা বলেও মনে করেন তিনি। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, মধুমতি নদীর পানি শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ত হয়ে যায়। যা কোনোভাবেই পানযোগ্য নয়, এমন অবস্থায় কেন ওই প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলো?

এই অদূরদর্শী প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের ওপর বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ানোর জন্য দায়িদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ব্যাপারে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ বলেন, খুলনা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সব সময় চেষ্টা করে চলেছে নগরবাসীর পানির চাহিদা পূরণ করার। মার্চ মাসের পর থেকেই নগরীতে পানির চাহিদা ক্রমতাগত বাড়তে থাকে। একইসঙ্গে পানির স্তর নামতে শুরু করে। ফলে চাহিদা আর জোগানের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে শুরু করে। সে কারণে ওয়াসার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থেকে এই সময়ে পানির সরবরাহ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, রমজানে যেন পানির জন্য হাহাকার না হয় সেজন্য রাতেও ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে ওয়াসার একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান মৌসুমে নদ-নদীগুলোর পানি লবণাক্ত হয়ে যায়। ফলে ট্রিটমেন্ট প্লান্টে পানি পরিশোধন করতে একটু হলেও সময় লাগে। সে কারণেই নগর অভ্যন্তরের উত্তোলক পাম্পগুলো চালাতে হয়।

Comment using Facebook