কেশবপুরে প্রশাসন ৪ বার বন্ধ করে দেয়ার পরও চলছে ইটভাটার কার্যক্রম

0
37

আজিজুর রহমান, কেশবপুর (যশোর)

কেশবপুরে রোমান ব্রিকস ইটভাটা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে ২ সচিবসহ ১৩ জনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।

ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল জরিমানাসহ প্রশাসন ৪ বার বন্ধ করে দেয়ার পরও ফের কার্যক্রম শুরু করেছে পরিবেশ দূষণকারী অবৈধ ওই ইটভাটাটি।

বেলার আইনি নোটিশে ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২ সচিবসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার, যশোরের জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, যশোরের পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক, কেশবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে এর কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসি সূত্রে জানা গেছে, কেশবপুরের উপজেলার কাস্তা বারুইহাটি চৌরাস্তা মোড়ের রোমান ব্রিকস ইটভাটাটি অবস্থিত।

২০১৭ সালে সাতবাড়িয়া গ্রামের দু’ভাই আবু বক্কর সিদ্দীক, মতিয়ার রহমান ও পাশ্ববর্তী কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেন রোমান ব্রিকসের কার্যক্রম শুরু করে। ওই বছরের ২৫ জানুয়ারি উপজেলার সাগরদাঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ও ২৯ জানুয়ারি উপজেলা পরিষদ থেকে বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে ওই ইট ভাটার কার্যক্রম চালানোর জন্য অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সে সমস্ত শর্ত না মানায় ২০১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইটভাটা বন্ধ করতে ওই এলাকার লোকজন ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে।

এরপর ভাটা বন্ধের দাবিতে এলাকাবাসী সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলন চলাকালে ভাটার মালিকরা ভুক্তভোগী কৃষকদের মারপিট ও ক্ষতিগ্রস্ত ভাটাবিরোধী এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে ও প্রভাব খাঁটিয়ে ভাটা পরিচালনা করে আসছে। জানা যায়, ২০১৮ সালের ১১ জানুয়ারি যশোর জেলা কার্যালয়ের পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট মিজানুর রহমান রোমান ব্রিকস সরেজমিনে পরিদর্শনকালে ইটভাটাটির অনুকূলে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অবস্থানগত বা পরিবেশগত কোন ছাড়পত্র না পেয়ে এবং ইট ভাটার অনুকূলে জেলা প্রশাসকের ইট পোড়ানোর লাইসেন্স না থাকায় ভাটাটির যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করেন।

প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে ভাটার কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় ২৫ জানুয়ারি তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজানূর রহমান ভ্রাম্যমাণ আদালতে রোমান ব্রিকসের মালিক আবু বক্কর সিদ্দীককে ৬ মাসের কারাদন্ডাদেশ প্রদান ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর যশোর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট একেএম নওশাদ ও তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজানূর রহমানের যৌথ উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে রোমান ব্রিকস বন্ধ করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

২০২০ সালে শ্রমিকদের নিয়ে ওই ইটভাটার কার্যক্রম চালানো হলে ১২ এপ্রিল উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ইরুফা সুলতানা অভিযান চালিয়ে ওই ভাটাটি বন্ধ করে দেন। এ ছাড়াও ওই ইটভাটার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী জনগণের পক্ষে কাস্তা গ্রামের নুর আলী মোড়ল মহামান্য হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থমূলক মামলা করেন (যার নং ২১২১/২০১৮)। মামলার চুড়ান্ত শুনানী শেষে উচ্চ আদালত ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারী ইটভাটা পরিচালনার উপযুক্ত স্থান না হওয়ায় রোমান ব্রিকস অন্যত্র স্থানান্তরের নির্দেশ প্রদান করেন।

উচ্চ আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে চলতি বছর ফের কার্যক্রম শুরু করলে এর প্রতিকার চেয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এর পক্ষে অ্যাডভোকেট এস হাসানুল বান্না ২৬ জানুয়ারি দুই সচিব ও ওই ইট ভাটার তিনজন মালিকসহ ১৩ জনের কাছে (নোটিশ অব ডিমান্ড ফর জাস্টিস) আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন।

সম্প্রতি কেশবপুরে পৌঁছানো ওই নোটিশে বলা হয়েছে, মেসার্স রোমান ব্রিকস নামক ইটভাটাটি সকল আইনী বিধান লঙ্ঘন করে আবাসিক এলাকার সন্নিকটে তিন ফসলী জমিতে কোনরুপ অবস্থানগত, পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ ব্যতিরেকে এবং ইটপোড়ানোর লাইসেন্স ছাড়াই সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইটভাটাটির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিত্রাণ পেতে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং কার্যক্রম বন্ধ রাখতে নোটিশ প্রদান করেন।

উচ্চ আদালতে মামলার বাদি কাস্তা গ্রামের নুর আলী মোড়ল বলেন, ভাটার পাশে বারুইহাটি মহিলা দাখিল মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক, কিরাতী মাদ্রাসা ও মন্দির অবস্থিত। এর আধা কিলোমিটারের মধ্যে ভালুকঘর বহুমুখি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সিনিয়র মাদ্রাসা রয়েছে। ভাটার গাড়িগুলোর জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ও সড়কে চলাচলকারী মানুষেরা সব সময় আতঙ্কে থাকে। ভাটার কারণে এর আশপাশের জমির ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রোমান ব্রিকসের মালিক মতিয়ার রহমান ওই ভাটার কোনই লাইসেন্স না পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘কেশবপুরের কোন ভাটারই লাইসেন্স নেই। তারা ভাটার কার্যক্রম চালাতে পারলে আমরাও চালাতে পারি।

তবে খুব শিগগির লাইসেন্স পেয়ে যাব। যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, রোমান ব্রিকসের পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু অবস্থানগত কারণে ছাড়পত্র দেওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন রোমান ব্রিকস সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চলছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার এম এম আরাফাত হোসেন বলেন, বেলার আইনি নোটিশ পাওয়ার পর পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর নিকট প্রেরণ করা হয়েছে।

Comment using Facebook