বন্ধুদের ঐক্য ধরে রাখতেই জন্ম বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশন

0
133

মোঃ আলাউদ্দিন খান হীরা

মানুষ একা বসবাস করতে পারে না, চলার পথে প্রয়োজন হয় বন্ধুর। তাই সমাজের অন্য সবার সঙ্গে প্রীতির মেলাবন্ধনে জড়িয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মায়াজালে মানুষের মধ্যে বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়।

সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে বন্ধুত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। বন্ধুত্বের কল্যাণে মনুষের কর্ম চিন্তা ভাবনা ও দৃষ্টি ভাঙ্গি পরিবর্তন এবং প্রভাবিত হয়। সেই বন্ধুত্বের কল্যাণের চিন্তা হতে বন্ধুত্বর অটুট বন্ধনের ঐক্যধরে রাখতে ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ১৩ বন্ধু মোঃ গোলাম এহিয়া, মোঃ আশরাফ হোসেন, মোঃ বশির আহমেদ, সৈয়দ দেলোয়ার হোসেন, এস,এম ফারুক হোসেন, আব্দুল জলিল মোল্লা, মুন্সী আব্দুর রশীদ, মোঃ গোলাম রিকিয়া, এস এম রফিকুল আলম, মোঃ শফিউল্লা মোল্লা, আবু তাহের সরকার, মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান, মোঃ জাহিদুল ইসলামের উদ্যোগে জন্মনেয় বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশন। দক্ষিণ অঞ্চলের তথা পদ্মার এপারে যতোগুলি এনজিও আছে তাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশন। যা বাংলাদেশ মাইক্রোক্রেডিড রেগুলেটরী অথরিটি সনদ প্রাপ্ত ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর সার্বিক সহযোগীতায় পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান।

বন্ধুত্বের অকৃত্রিম ভালবাসা, একে অপরের প্রতি প্রগড় বিশ্বাস ও সম্মানবোধ হতে এ প্রতিষ্ঠান আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। এবার আমার জেনে দেখি কি ভাবে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছিলো। যশোর খুলনা মহসড়কের পাশে জাফরপুর ঘোড়াবটতলা তৎকালিন এনায়েত পেপার মিলের (বর্তমান আহাদ সিমেন্ট ফেক্টরী) সামনে। প্রতি সপ্তাহে সবুজ ঘাসের বিছানা পেতে বন্ধুদের চায়ের চুমুকের আড্ডায় এক মধুময় পরিবেশে নিজেদের হারিয়ে ফেলতেন বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশনের বন্ধুরা। স্মৃতির ধুসরতায় ঠিক কোন বন্ধুর মুখ হতে প্রস্তাবটি বের হয়েছিল তা স্পষ্ট মনে না হলেও অধিকাংশ বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী মোঃ জাহিদুল ইসলামের প্রস্তাবনায় সমর্থন দেন মোঃ আশরাফ হোসেন। তবে প্রস্তাবটি ছিলো আমরাতো প্রতি সপ্তাহে সবার কাজ শেষে মিলিত হয় এই আড্ডায়। চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতেও খরচ হয় ১০টাকার। আমরা যদি এই ১০টাকা করে প্রতি সপ্তায় সঞ্চয় করি তাহলে কেমন হয়।

প্রস্তাবটি সকলের মনোভুতো হওয়াই উপস্থিত ৯ বন্ধুর সাথে আরো ৪ বন্ধুকে নিয়ে কার্পেটিং মিলের সামনে হাফিজের চায়ের দোকানে প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয় বন্ধুকল্যাণ সমিতির। সেখান হতে আলোচনা আরো বেগবান করতে যাওয়া হয় তাদের বন্ধুদের মধ্যে এস,এম ফারুক হোসেনের কাঠগোলায়। মিটিং এ চুড়ান্ত সিন্ধান্ত হয় সপ্তাহ ১০টাকা হারে চাঁদা জমা করা হবে। যদি কেউ চাঁদার টাকা দিতে না পারে তাহলে পরের সপ্তাহে ১ টাকা জরিমানাসহ জমা দিতে হবে। কালেকশনের দায়িত্বভার পড়ে আব্দুল জলিল মোল্লা উপরে। তিনি দীর্ঘ দিন সেই দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠার সাথে। সমিতির কার্যক্রম নিদ্ধারন হয়ে যাবার পর এবর প্রয়োজন একটি সুন্দর নামের। সকলের প্রস্তাবিত অনেক গুলো নামের মাঝ হতে শফিউল্লা মোল্লার প্রস্তাবিত বন্ধুকল্যাণ নামটি বেছে নেওয়া হয়। যাত্রা শুরু হয় বন্ধুকল্যাণ সমিতির। ১৯৯২ সালে ২২ মে আনুষ্ঠিকতার মাধ্যমে ১৩ জন বন্ধুর সাথে যুক্ত হয় তাদের সহধর্মিনিদের মধ্যো হতে ১২ জন সহধর্মিনি। মোট সদস্য হয় ২৫ জন। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে ঋণ কার্যক্রমে অনেক সদস্য ঘোর বিরোধি ছিলো কিন্তু প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের স্বার্থে সবাই একমত হয়ে ১৯৯৬ সালে ঋণ কার্যক্রম শুরুকরে। ধাববান উন্নয়নের গতিকে তরান্নিত করতে বন্ধুকল্যাণ যুক্ত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরাকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর সাথে। ১৯৯৩ সালে কার্পেটিং জুট মিলের সামনে জনতা ব্যাংকের উপরে ৬০ জনকে নিয়ে পালিত হয় ঈদ পূর্ণমিলন অনুষ্ঠান ও প্রথম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। দেখতে দেখতে পার হয়েগেছে ২৭টা বছর।

বর্তমান প্রতিষ্ঠানটি ৭টি জেলায় ৩৭টি শাখার মাধ্যমে সুনামের সাথে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২ শত ৮০ জন ক্রেডিড প্রোগ্রামে, ৪০ জনের মতোন সমৃদ্ধি প্রজেক্টে কর্মরত আছে। দেশের উন্নয়নে বাৎসরিক ভ্যাট ও কর প্রদান করছে ১৩ লক্ষাধিক টাকা এবং জনসেবা মূলক কাজে এম.আর.এ নির্দেশিত ব্যয় করা হচ্ছে ২২ লক্ষ টাকা। প্রতি মাসে ৭৯ লক্ষ টাকা বেতন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। সাবলম্বি করা হয়েছে ৩ শত ২০ জন পরিবারকে। বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশন ক্রেডিট প্রোগ্রামের পাশাপাশি আত্ন মানবতার সেবায় নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছে। শ্রবন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধিদের সমাজের মূল শ্রতধারায় সংযুক্ত করার লক্ষে ২জন ফিজিও থেরাপিষ্ট, ৩ জন ফিল্ড এডুকেটর ও ১জন অবিজ্ঞ প্রতিবন্ধি পূর্ণরবাসন কর্মকর্তা নিরালস ভাবে কাজ করে চলেছে। তাদের সহায়তায় বর্তমান ৬০ জন শ্রবন ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধি সেবা গ্রহণ করেছে পাশা পাশি থেরাপি টিটমেন্টে সুস্থ্য করে তোলা হচ্ছে পঙ্গু ও প্যারালাইসেস রোগীদের।

এপর্যন্ত ২ হাজার ৩ শত ৮৬ জন এখান হতে সেবা গ্রহণ করেছে। এই সেবা অভয়নগর প্রতিটা ইউনিয়ন ও পাসের উপজেলা ফুলতলা ও মনিরামপুরকেও কর্মের আওতায় আনা হয়েছে। সমৃদ্ধ প্রজেক্টের সমন্বয়কারী জানান তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে ৬ জন ভিক্ষুককে ১ লাখ টাকা দিয়ে পূণর্বাসন করছেন। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানিয় প্রতিনিধিদের নিয়ে কালবাট নির্মান করেছেন ১০টি, ৪ শত সেনেটারী ল্যাট্রিন, ১০টি টিউবয়েল ও ১টি ডিপ টিউবয়েল স্থাপন করেছেন। বয়স্কদের জন্য প্রবিন সামাজিক কেন্দ্রে ঘর নির্মান করেছেন। বয়স্কদের মধ্যে ৭৭ জনকে প্রতি মাসে ৫শত টাকা করে ভাতা প্রদান করেন। প্রবিনদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করেন। ১ জন স্বাস্থ্য কর্মকর্তার অধিনে ৯ জন স্বাস্থ্য সেবিকা প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে থাকেন। ২১ জন শিক্ষক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন ১ম শ্রেনী হতে ৩য় শ্রেনী পর্যন্ত। সল্প সম্পদের বহু মূখি ব্যবহার নিশ্চিত করতে ৫০টি বাড়ি সমৃদ্ধির আওতায় আনা হয়েছে।পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) এর সহযোগীতায় কিশোর ও কিশোরীদের মেধা ও মননে সুন্দর আগামী উপহার দেওয়র লক্ষে কৌশর কর্মসূচির আওতায় অভয়নগর উপজেলায় ১২টি কিশোরী ও ৫টি কিশোর ক্লাব মোট ও ১৭টি ক্লাব ১জন প্রেগ্রাম অফিসার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশনে যে ব্যক্তিটি বন্ধুদের মধ্য হতে এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মূলকান্ডারী হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে চলেছেন। যার কঠর পরিশ্রম সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অদ্বিতীয় ক্ষমতা ও সততা নিষ্ঠার ফসল বর্তমান এ বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশন। সেই নির্বাহি পরিচালক মোঃ গোলাম এহিয়া বলেন, বন্ধুদের আড্ডা হতে সৃষ্ট বন্ধুদের ঐক্যধরে রাখতে পতিষ্ঠিত বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশনে যখন দেখতে পেলাম জনসাধারণের অনেক টাকা সঞ্চয় হয়েগেছে। যা জনসাধারণ আমাদের বন্ধুদের উপর একান্ত বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে আমানত হিসাবে রেখেছেন। সেই অর্থ কোন ভাবে বেহাত হলে বন্ধুদের বদনাম হয়ে যাবে বন্ধুদের ঐক্যে ফাটল ধরবে। সেই সম্মান রক্ষায় অনেকটা দায় বদ্ধতা থেকে এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বভার গ্রহণ করি।

একটি স্বপ্নছিলো বন্ধুদের যে আড্ডাটা দিয়ে বন্ধুকল্যাণের সৃষ্টি সেই আড্ডাটা ৬০ বছর পরও যেন অম্লান না হয়। সেই লক্ষে বন্ধুদের শরীরিক সুস্থ্যতার উপর নির্ভর করে তাদের ইচ্ছার ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রদানের মাধ্যমে আমারা একে অপরের পাশা পাশি থাকবো। আমাদের আড্ডাটা ও ঐক্য বহাল রাখবো। আজ আমার সেই আশা অনেকটা পূরন হয়েছে। আমার লক্ষ্য সার্বিক ভাবে বন্ধুকল্যাণ ফাউন্ডেশনকে আরো বেগবান ও উান্নত পর্যায়ে পৌছানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যদিয়ে টেকসই ভাবে দারিদ্র বিমোচনে দেশের মাঝে একটি অবস্থান তৈরি করবো ইনশা আল্লাহ্।

Comment using Facebook